ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিতে দেশের ৮টি জেলায় হঠাৎ বন্যা দেখা দিয়েছে। ভারতের ত্রিপুরার বাঁধ খুলে দেয়ার পর বাংলাদেশে হু হু করে ঢুকছে পানি। পানির তোড়ে সেতু ভেঙে আখাউড়া-আগরতলা সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। মৌলভীবাজারে বন্যার পানিতে দুই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। কুমিল্লায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে কয়েকশ’ পরিবার, সরিয়ে নেয়া হচ্ছে মালামাল। ফেনীতে বানভাসি মানুষের বাঁচার আকুতি। সেখানে উদ্ধারে সেনাবাহিনী-বিজিবি’র সদস্যরা কাজ করছেন।
জানা গেছে, ১৯৯৩ সালের পর প্রথমবারের মতো খুলে দেয়া হয়েছে ভারতের ত্রিপুরার ডিম্বুর জলাধারের বাঁধ। গত কয়েকদিন ধরে ত্রিপুরায় ব্যাপক বৃষ্টিপাতে জলাধারের পানি বৃদ্ধি পায়। এরপরই বাঁধের স্লুইস গেট খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। গত কয়েকদিনের বৃষ্টিতে ত্রিপুরার বিভিন্ন জায়গায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। ভারতীয় এ রাজ্যটির এমন কোনো সমতল স্থল নেই যেখানে বন্যার পানি ঢোকেনি। এমন পরিস্থিতিতে বাঁধটি খুলে দেয়া প্রয়োজন ছিল বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। তবে বাঁধটি খুলে দেয়ার পর বন্যা পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। নদী ও অন্যান্য জলাধারের পানি ধারণ ক্ষমতার চেয়ে বেড়ে গেছে। আবাসিক এলাকা, কৃষি জমিসহ সবকিছু এখন পানির নিচে রয়েছ। ত্রিপুরায় অতিবৃষ্টি এবং বাঁধ খুলে দেয়ার পর হু হু করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে পানি। এতে করে ফেনীর পরশুরাম, ফুলগাজী এবং ছাগলনাইয়া উপজেলায় প্রবল বন্যা দেখা দিয়েছে।
গত কয়েকদিনের ভারী বৃষ্টি ও ভারতের উজানের পানিতে গত সোমবার দুপুর থেকে মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ভাঙন স্থান দিয়ে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করতে শুরু করে। এতে তিন উপজেলার রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও মাছের ঘের পানিতে তলিয়ে গেছে। লোকালয়ে পানি ঢুকে শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ফেনী-পরশুরাম আঞ্চলিক সড়ক ও উপজেলার অভ্যন্তরীণ সড়কে বন্ধ আছে যান চলাচল। লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বিদ্যুৎ সংযোগও। ১৯৯৩ সালেও অতিবৃষ্টির পর ত্রিপুরার ডিম্বুর জলাধারে নির্মিত বাঁধটি খুলে দেয়া হয়েছিল। তবে ৩১ বছর পর হওয়া এবারের বন্যা পরিস্থিতি সেবারের চেয়ে খারাপ। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ত্রিপুরায় এ বন্যার প্রভাব দীর্ঘদিন থাকবে। বাঁধ খুলে দেয়ার পর ত্রিপুরায় উৎপত্তি হওয়া গোমতী নদী দিয়ে বাংলাদেশের কুমিল্লায় ঢুকছে বন্যার পানি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় ভারতীয় পাহাড়ি ঢলের পানির তোড়ে ভেঙে গেছে সেতু। গতকাল বুধবার সকালে উপজেলার গাজীর বাজারের জাজিরপুর এলাকার এই সেতুটি ভেঙে যায়। এতে আখাউড়া-আগরতলা সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। তবে সেতুটি ছিল অস্থায়ী।
স্থানীয় লোকজন ও প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার রাত থেকে আখাউড়ায় ভারী বর্ষণ শুরু হয়। গতকাল বুধবার সকাল থেকে বন্দরের পাশ বয়ে যাওয়া খাল দিয়ে ভারত থেকে তীব্র বেগে পানি ঢুকতে থাকে। এক পর্যায়ে পুরো স্থলবন্দর এলাকা পানিতে প্লাবিত হয়। এত বন্ধ হয়ে যায় বন্দরের যাত্রী পারাপার ও আমদানি-রফতানির কাজ। সেই পানির তোড়ে ভেঙে যায় গাজীরবাজার এলাকার অস্থায়ী এই বেইলি সেতু। এর আগে, খলাপাড়া এলাকায় হাওড়া নদীর বাঁধের কিছু অংশ ভেঙে পানি ঢুকতে শুরু করে। সেই থেকে বাউতলা, বীরচন্দ্রপুর, কালিকাপুর, বঙ্গেরচর, সাহেবনগরসহ ৩৪টি গ্রামে পানি ঢোকে। এতে ঘরবন্দি হয়েছে সেসব গ্রামের ৩৪টি গ্রামের ৫২০টি পরিবার। খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) গাজালা পারভীন রুহি ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা তাপস কুমার চক্রবর্তী ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরির্দশন করেন। এ ব্যাপারে গাজালা পারভীন রুহি বলেন, পানিতে উপজেলার ৩৪টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে ৫২০টি পরিবারের লোকজন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এলাকাবাসী মিলে বাঁধের অংশ মেরামত করেছেন। সেতুটি মেরামতের জন্য সড়ক ও জনপথ বিভাগকে খবর দেয়া হয়েছে। তবে দ্রুত যান চলাচলের উপযোগী করা যাবে না। তিনি বলেন, এ ছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। হিসাব না করে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বলা যাবে না।
ভারী বৃষ্টি ও ভারতের উজানের পানিতে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছে ফেনীর পরশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া উপজেলা। মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের সবগুলো ভাঙনের স্থান দিয়ে প্রবল বেগে পানি প্রবেশ করে ডুবছে একের পর এক জনপদ। এতে বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন লাখ লাখ মানুষ। ভয়াবহ এই বন্যায় বানভাসি মানুষদের উদ্ধারে গতকাল বুধবার দুপুর আড়াইটা থেকে কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।
জানা গেছে, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বন্যাকবলিত এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার করতে সেনাবাহিনী ও কোস্টগার্ডের সহযোগিতা চাওয়া হয়। এরপর স্পিডবোট নিয়ে উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করে তারা। একইসঙ্গে বিজিবি সদস্য ও জেলা স্বেচ্ছাসেবক পরিবারের শত শত স্বেচ্ছাসেবক উদ্ধার ও খাদ্য সহায়তা প্রদান করছেন। এদিকে গতকাল বিকেলে আইএসপিআরের পক্ষ থেকে বার্তা দিয়ে জানানো হয়, ফেনী জেলার পরশুরাম ও ফুলগাজীতে বন্যার্তদের উদ্ধারে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। উদ্ধার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে স্পিড বোট ও হেলিকপ্টার। বন্যাকবলিত পরশুরাম উপজেলার সাতকুচিয়া এলাকার বয়োবৃদ্ধ আবদুর রহমান বলেন, বিগত জীবনে এমন ভয়াবহ বন্যা কখনো দেখিনি। সময় বাড়ার সঙ্গে বন্যা ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। টানা বৃষ্টি পড়তে থাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। রাসেল নামে এক স্বেচ্ছাসেবক বলেন, ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পক্ষ থেকে সহায়তা নিয়ে আসছে। কিন্তু পানির তীব্র স্রোতের কারণে পরশুরামে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তারপরও আমাদের সদস্যরা বিভিন্ন পয়েন্টে কাজ করার চেষ্টা করছে। টানা বৃষ্টিতে চারদিকে পানি থই থই।
ফেনী আবহাওয়া অধিদফতরের উচ্চ পর্যবেক্ষক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, ফেনীতে টানা তিন দিন মাঝারি ও ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। জেলায় গতকাল বুধবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ১০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী ৭২ ঘণ্টা বৃষ্টি অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ ব্যাপারে ফেনী জেলা প্রশাসক মুছাম্মৎ শাহীনা আক্তার বলেন, বন্যাদুর্গতদের উদ্ধারে সেনাবাহিনী স্পিডবোট নিয়ে কাজ শুরু করেছে। তাদের সঙ্গে কোস্টগার্ডের একটি টিম শিগগিরই যোগ দেবে। এ ছাড়া বিজিবি ও স্বেচ্ছাসেবকরা সকাল থেকে আটকে পড়া মানুষদের নিরাপদ আশ্রয়ে আনতে কাজ করছে।
সূত্র জানায়, দেশের মধ্যে ভারী বৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা ঢলে দেশের আট জেলা বন্যাকবলিত হয়েছে। বন্যা আরও নতুন নতুন অঞ্চলে বিস্তৃত হতে পারে বলে জানিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। গতকাল বুধবার বিকেলে সচিবালয়ে চলমান বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী রেজা। তিনি বলেন, দেশের সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ফেনী, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কুমিল্লা ও খাগড়াছড়ি জেলা বন্যাকবলিত হয়েছে। অতিরিক্ত সচিব বলেন, আবহাওয়া সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, আগামী ৪৮ ঘণটায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন উজানে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে। ফলে এ সময় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার প্রধান নদীসমূহের পানি সমতল কতিপয় পয়েন্টে সময় বিশেষে বৃদ্ধি পেতে পারে। তিনি বলেন, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলের প্রধান নদীগুলোর পানি এই মুহূর্তে বাড়ছে। কুশিয়ারা, মনু, ধলাই, খোয়াই, মুহুরী, ফেনী, হালদা নদীর পানি ৭টি স্টেশনে বিপদসীমার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন আলী রেজা। আগামী ২৪ ঘণ্টায় মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার মনু, খোয়াই, ধলাই ও সারিগোয়াইন নদীর পানি কয়েকটি পয়েন্টে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। এ কারণে ওই সব অঞ্চলের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে পারে।
বন্যা আক্রান্ত জেলাগুলোতে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে জানিয়ে অতিরিক্ত সচিব বলেন, বন্যা আক্রান্ত জেলার জেলা প্রশাসক, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক, সেনাবাহিনী, অন্য স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে সমন্বয় করে স্থানীয় প্রশাসন কাজ করছে। তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা মন্ত্রণালয় থেকে দেয়া হয়েছে। বন্যা আরও বাড়বে কি না-জানতে চাইলে এ কর্মকর্তা বলেন, আগামী কয়েক ঘণ্টার সেটার সম্ভাবনা রয়েছে। বাকিটা আপনাদের বৃহস্পতিবার (আজ) বলতে পারবো।
ত্রাণ কার্যক্রমের বিষয়ে- দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মোহাম্মদ নাজমুল আবেদীন বলেন, এরই মধ্যে বন্যাদুর্গত এলাকায় ত্রাণ কাজের জন্য নগদ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। চাল ও শুকনা খাবার দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের জেলা গুদামগুলোতে পর্যাপ্ত ত্রাণ মজুত রয়েছে। প্রকৃত রিপোর্টের ভিত্তিতে আমরা বন্যাদুর্গতদের কাছে আরও ত্রাণ পৌঁছে দিতে পারবো। আমরা খবর পেয়েছি ইতোমধ্যে সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনী টিম ফেনীতে পৌঁছে গেছে। তারা উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করেছে। ? সেখানে সেনাবাহিনীর ছয়টি বোট চলে গেছে। যুগ্মসচিব আরও বলেন, ফেনী জেলা প্রশাসকের দেয়া প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৭৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে এক হাজার ৬০০ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। অন্যান্য জেলার প্রতিবেদন এখনো পাওয়া যায়নি। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে ফেনী জেলা। টানা বৃষ্টিতে চাঁদপুরে পদ্মা-মেঘনা নদীর পানি কিছুটা বেড়েছে। গত মঙ্গলবার দিনগত রাত ১২টা থেকে বুধবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত ৭১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। বৃষ্টির কারণে জনজীবন অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে।
এদিকে, ফেনীর ফুলগাজী-পরশুরামে বন্যার পানিতে আটকাপড়াদের উদ্ধারে নেমেছে সেনাবাহিনী। উদ্ধারে কাজ করছে বিজিবি ও কোস্টগার্ড। প্রস্তুত রাখা হয়েছে হেলিকপ্টারও। ৮ জেলা বন্যাকবলিত, আরও বিস্তৃত হতে পারে আগামী ২৪ ঘণ্টায় দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ফেনী ও চট্টগ্রাম জেলার মুহুরী এবং হালদা নদীর পানি সমতল বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। ফলে এসব এলাকার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকতে পারে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে ভয়াবহ বন্যার কবলে পুরো খাগড়াছড়ি। বিভিন্ন উপজেলায় পানিবন্দি হাজার হাজার মানুষ। খাগড়াছড়ি জেলা সদরে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও দীঘিনালায় পরিস্থিতি অপরিবর্তিত।
এদিকে টানা বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, জুড়ী, কমলগঞ্জ, রাজনগর ও সদর উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়নের হাজার হাজার ঘরবাড়ি। এতে কমপক্ষে দুই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। সরেজমিনে দেখা গেছে, টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে একাধিক স্থানে বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। উজানের পাহাড়ি ঢলে উপজেলার ইসলামপুর, আদমপুর, মাধবপুর, কমলগঞ্জ, শমশেরনগর, রহিমপুর, পতনঊষা, মুন্সিবাজার ইউনিয়নের প্রায় ৩০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানির নিচে তলিয়ে গেছে উপজেলার বেশিরভাগ সড়ক।
পাহাড়ি ঢলে কমলগঞ্জ-আদমপুর আঞ্চলিক সড়কের ঘোড়ামারা ও ভানুবিল মাঝেরগাঁও এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। আদমপুর ইউনিয়নের ঘোড়ামারা, রানিরবাজার, ইসলামপুর ইউনিয়নের মোকাবিল ও কুরমা চেকপোস্ট এলাকায় নদীর বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। লোকালয়ে পানি প্রবেশ করেছে। আদমপুর-ইসলামপুর সড়কের হেরেঙ্গা বাজার, শ্রীপুর ও ভান্ডারিগাঁও এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। কুলাউড়ায় বিভিন্ন স্থানে বাঁধ ভেঙে শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে উপজেলার টিলাগাঁও, জয়চণ্ডী, সদর, রাউৎগাঁও ও পৃথিমপাশা ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় সহস্রাধিক মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। সড়ক পথেও অনেক গ্রামের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এদিকে উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে পানিবন্দিদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রয়েছে।
কয়েক দিনের টানা বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল এবং উজান থেকে নেমে আসা পানিতে জেলার সবকটি নদনদীতে পানি বাড়ছে বলে জানিয়েছে মৌলভীবাজারের পাউবো। সংশ্লিষ্টরা জানান, টানা বর্ষণে মনু ও ধলাই নদীর অন্তত পাঁচটি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে উপজেলার পাঁচ ইউনিয়নের সহস্রাধিক মানুষ বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছেন। বন্যার তলিয়ে গেছে জুড়ী উপজেলার ফুলতলা, গোয়াবাড়ি ও সাগরনাল ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলের শতাধিক গ্রাম। ৪০ হেক্টরের বেশি আমন ধান জলমগ্ন হয়ে ডুবে গেছে। রাজনগর উপজেলার মনু নদীর বাঁধ ভেঙে টেংরা ও তারাপাশা ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এদিকে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার খলিলপুর ও চাঁদনীঘাট ইউনিয়নেরও কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, জেলার মনু নদী (রেলওয়ে ব্রিজ) বিপদসীমার ১০৫ সেন্টিমিটার চাঁদনীঘাট এলাকায় ৭০ সেন্টিমিটার, ধলাই নদীতে ৮ সেন্টিমিটার ও জুড়ী নদীতে বিপদসীমার ১৭৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কুশিয়ারা নদীর পানিও বিপদসীমা স্পর্শ করেছে। বন্যা কবলিত মানুষরা বলছেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসন মাঠে না থাকায় বিগত বন্যার মতো তারা সহযোগিতা পাচ্ছেন না। অনেক নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারছেন না।
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জাবেদ ইকবাল বলেন, ধলাই নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে আটটি স্থান দিয়ে বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। মনু নদীরও বাঁধও ভেঙে গেছে। ভারতের ত্রিপুরায় বৃষ্টি হওয়াতে নদনদীতে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। বৃষ্টি কমে গেলে পানি নেমে যাবে। এছাড়া যেসব স্থানে বাঁধ ভেঙেছে সেগুলোতে কাজ চলছে বলে তিনি জানান।
এছাড়াও কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে কুমিল্লার গোমতী নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে নদীর চরের সকল অঞ্চল প্লাবিত হয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে কয়েকশ পরিবার। গতকাল বুধবার ভোরে আকস্মিক পানিতে তলিয়ে যায় গোমতী নদীর চরের গ্রামগুলো। দুপুর ১টার দিকে নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে। বিকেল ৪টার দিকে ১২ দশমিক ৩৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হতে দেখা গেছে। নদীর বিপদসীমা ১১ দশমিক ৭৫ সেন্টিমিটার।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। এর ফলে গোমতী নদীর উৎপত্তিস্থল ভারতের ডম্বুরা লেকের বাঁধ খুলে দেয়ায় ত্রিপুরার বন্যার পানি নেমে আসছে কুমিল্লার দিকে গোমতী নদী দিয়ে। তবে বিকেল পৌনে ৫টার দিকে গোমতীর বাঁধের কোথাও কোনো সমস্যার খবর পাওয়া যায়নি।
এদিকে গোমতীর পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নদীর চরের সকল অঞ্চল প্লাবিত হয়ে পানিবন্দি হয়েছে কয়েকশ পরিবার। জেলার আদর্শ সদর উপজেলার টিক্কারচর, চাঁনপুর, ডুমুরিয়া চাঁনপুর, পালপাড়াসহ নদীর গহ্বরে বসতি গড়া সকল পরিবার পানিবন্দি হয়েছে। এতে বিপাকে পড়েছেন সেসব পরিবারের মানুষেরা।
চাঁনপুর এলাকার বানভাসি শাহিদা আক্তার বলেন, গত মঙ্গলবার রাতেও পানি অনেক কম ছিল। আমরা স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি এমন হবে। ভোর হওয়ার কিছুটা আগে থেকে দেখি পানি ঘরে প্রবেশ করছে। ঘণ্টা খানেকের মধ্যে ঘরে পানি ঢুকে দুপুরের দিকে ঘরের অর্ধেক তলিয়ে গেছে।
জয়নাল মিয়া নামে আরেকজন বলেন, আগে জানলে গতকালই ঘরের আসবাব সব তুলে নিতাম বাঁধে। আজ সকালে হঠাৎ পানি এসে আমাদের ডুবাতে শুরু করল। অন্যদের সহযোগিতায় গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি এবং ঘরের অন্যান্য মালামাল বাঁধের সড়কে তুলেছি। এগুলো সড়কের ওই পাড়ে জেঠাতো ভাইয়ের বাসায় নিচ্ছি গাড়িতে করে। আমরা আপাতত সেখানেই উঠব। বিকেল ৪টার দিকে সরেজমিনে দেখা যায়, বেশ কয়েকটি পরিবারকে উদ্ধার কাজে সহায়তা করছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থী, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং কুমিল্লা মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের নেতারা। এছাড়াও বানভাসি মানুষদের মাঝে রান্না করা খাবারও বিতরণ করতে দেখা গেছে তাদের।
কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সোমেন রায় বলেন, আমরা তিনটি আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছি। বানভাসি মানুষের খাদ্য সহায়তা চলমান রয়েছে। এছাড়াও কাকড়ি নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে জেলার চৌদ্দগ্রামে অনেক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ডাকাতিয়া নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে ১০-১২ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়েছে। তাছাড়া সালদা নদীতে পানি বৃদ্ধি পেয়ে ব্রাহ্মণপাড়া এলাকার বেশ কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
কুমিল্লা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শেখ ওয়ালিউজ্জামান বলেন, পানি নদীর বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও গোমতীর বাঁধ অক্ষত আছে। আশা করছি বাঁধে তেমন সমস্যা হবে না। গোমতীর গহ্বরে অবৈধভাবে বসতি গড়া পরিবারগুলোই আক্রান্ত হয়েছেন। ফায়ার সার্ভিসসহ আমাদের বেশ কয়েকটি টিম নদীর তীরে অবস্থান করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে নিয়োজিত আছে। প্রয়োজনীয় সকল উদ্যোগ নেয়া হবে। ভারতের ত্রিপুরায় চরম বিপদসীমার উপর দিয়ে বইছে গোমতী নদীর পানি। ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী গতকাল বুধবার সন্ধ্যার পর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তবে নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার কেশাড়পাড় ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের মোল্লাবাড়ির তাহেরা বেগম জানান, ‘চুলায় আগুন দিতে পারি নাই। সকালে মুড়ি খেয়েছি। বৃষ্টিতে রান্নাঘরে পানি উঠেছে। রান্না না করলে সন্তানদের কি খাওয়ামু। এত পানি রান্না করারও উপায় নাই। বাবা এত বৃষ্টি, এত পানি জীবনেও দেখি নাই।’
তবে খাগড়াছড়ির মাইনি ও কাচালং নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় ডুবে গেছে খাগড়াছড়ি-সাজেক সড়কের একাধিক অংশ। ফলে সাজেক বেড়াতে এসে আটকা পড়েছেন প্রায় আড়াইশ পর্যটক। বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে দীঘিনালার মেরুং ও কবাখালি ইউনিয়নের ৩০ গ্রাম। অন্যদিকে চেঙ্গী নদীর পানি কমে যাওয়ায় খাগড়াছড়ি সদর উপজেলা থেকে বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে। গত মঙ্গলবার বিকেল থেকে কবাখালি, বাঘাইহাট বাজার ও মাচালং বাজারসহ সাজেক সড়কের একাধিক অংশ পাঁচ থেকে ছয় ফুট পানির নীচে তলিয়ে যায়। এতে সড়কটিতে পর্যটকবাহী যানবাহনসহ সব ধরনের চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) শিরিন আক্তার জানান, সাজেক সড়কের বিভিন্ন অংশে পানি উঠে যাওয়ায় যান চলাচল বন্ধ আছে। এতে সাজেকে আটকা পড়েছেন অন্তত ২৫০ জন পর্যটক। তারা আজকে ফিরতে পারবেন না।
খাগড়াছড়ি পৌর শহরের মুসলিম পাড়ার বাসিন্দা শান্ত ইসলাম, তোফায়েল মিয়া বলেন, তাদের এলাকায় এবার কয়েক দফায় বন্যা হয়েছে। তবে এখনো কোনো ত্রাণ সহায়তা বা খাবার পাননি তারা।
তবে খাগড়াছড়ির পৌরসভার প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, বন্যা দুর্গতদের জন্য ১২ টন খাদ্যশস্য বরাদ্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে দুই হাজার ৫৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে দীঘিনালার বন্যা পরিস্থিতি এখনো অপরিবর্তিত। পানিতে ডুবে আছে মেরুং ও কবাখালি ইউনিয়নের ৩০ গ্রাম। এছাড়া পাহাড়ি ঢলে দীঘিনালা-লংগদু সড়কের হেড কোয়াটার এলাকায় সড়ক ডুবে যাওয়ায় রাঙামাটির লংগদুর সঙ্গে সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে।
মেরুং ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান ঘনশ্যাম ত্রিপুরা বলেন, আশ্রয়কেন্দ্রে আসা বন্যাদুর্গতদের শুকনো খাবার ও খিচুড়ি রান্না করে খাওয়ানো হয়েছে। মাইনী নদীর পানি না কমায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। এখনো মেরুং বাজার পানির নীচে। গত মঙ্গলবার রাতে বন্যাদুর্গতদের মধ্যে রান্না করা খাবার বিতরণ করে জেলা বিএনপির নেতাকর্মীরা।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata

হঠাৎ বন্যায় আট জেলা আক্রান্ত
উজানের পাহাড়ি ঢল আর টানা বৃষ্টি
- আপলোড সময় : ২২-০৮-২০২৪ ০১:১৮:২০ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ২২-০৮-২০২৪ ০১:১৮:২০ অপরাহ্ন


কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ